ঢাকা, শুক্রবার, ১৬ নভেম্বর, ২০১৮
আত্মহত্যা

আত্মহত্যা

তাসনিম রিফাত | আপডেট : ২৯ জানুয়ারি, ২০১৮ ১০:২৬
আত্মহত্যা

আত্মহত্যা
তাসনিম রিফাত

ডেকের মধ্যে একা দাড়িয়ে আছি,লঞ্চ প্রায় খালি। নদীর পানি ভেঙে লঞ্চ আস্তে আস্তে এগিয়ে যাচ্ছে। রাত হয়েছে অনেক, এমন এক পরিবেশে নিস্তব্ধতা ছাড়া অন্য কিছু মানায় না। রাতের আকাশে আজ খুব বেশি তারা। চাঁদের মৃদু আলো আর ইঞ্জিনের মিহি শব্দ আমার বিশ্বস্ত ভ্রমণসঙ্গী। কিন্তু মনের মধ্যে একটা আশঙ্কা খচখচ করছে। আসলে কয়েকদিন আগেই এ রুটে একটা বড় লঞ্চডুবির ঘটনা ঘটেছে। বেশিরভাগ মানুষই মারা গেছে সে দুর্ঘটনায়। আর,মানুষের মন তো আশঙ্কাপ্রবণ,যেমনভাবে বেড়ালেরা খুব সতর্ক থাকে। এই সময়ে লঞ্চে চড়তে মন সায় দিচ্ছিল না,কিন্তু  বাড়ি যাওয়াটা বাধ্যতামূলক হয়ে দাঁড়িয়েছে।   আমি খোলা আকাশের নিচে ডেকের উপর দাঁড়ানো এক একলা মানুষ- যে এইমাত্র একটা সিগারেট জ্বালালো,মন থেকে অদ্ভুত চিন্তা দূর করতে।

সহসাই একজন লোককে দেখতে পেলাম, সম্ভবত মধ্যবয়স্ক ভদ্রলোক। তিনিও একা ডেকে,সিগারেট টানছে।  কাছে গেলাম,ভাবলাম একটু আলাপ জমাই। লোকটা নিথর দৃষ্টিতে নদীর দিকে তাকিয়ে আছে। কাছে গিয়ে 'কেমন আছেন?' জিজ্ঞেস করলাম। উনি শুকনো খটখটে গলায় জবাব দিলেন ভালো আছেন। (এমন শুকনো গলা আমি কেবল ৯০ বছর বয়স্ক প্রাণহীন বৃদ্ধদের মুখে শুনেছি।) পরে জিজ্ঞেস করলেন চাঁদপুর যাচ্ছি কিনা। এই লঞ্চ চাঁদপুর যাবে। চাঁদপুরই তো যাচ্ছি। জিজ্ঞেস করার কি হল!

'চাঁদপুরে কোথায় যাবেন?' আমি জিজ্ঞেস করলাম।
' কোথাও যেতে ইচ্ছা করছে না, কোন জায়গা নেই লুকাবার,মরে যাওয়ার কিংবা বেঁচে থাকার। এমনকি বনও নয়। সেখানে বিদ্যুৎকেন্দ্র হবে,সবজায়গায় বাল্ব জ্বলবে,কবরও আলোকিত হবে। মৃতরাও আলো পাবে কিন্তু শান্তি পাবে না। ' উনি বললেন।

আমি জিজ্ঞেস করলাম একলা যাচ্ছেন কিনা।
উনি উত্তরে বললেন, 'মানুষ তো চিরকাল একলাই যায়।'আপনি কখনোই একজন বন্ধু খুঁজে পাবেন না,যখন আপনি যুদ্ধ করছেন।'
প্যাঁচানো কথা আমার একেবারেই পছন্দ নয়। মারাত্নক বিরক্ত হলাম। ভাবলাম কেবিনে চলে আসবো। পরে ভাবলাম সেখানে গেলে তো একা থাকতে হবে। একা আমার ভালো লাগছে না,আমার এই লোকের কথাও বিরক্তিকর। তিনি আবার বকবক শুরু করলেন, 'আত্মহত্যা করতেও পারবেন না আপনি। পৃথিবীর সব নদীর স্রোত আপনাকে ফিরিয়ে দেবে। আপনি তখন  টের পাবেন মরে যাওয়ার আগেই আপনি মরে গেছেন।'

এবার একটা অস্বস্তি ঘিরে ধরল আমায়। এমনিতেই লঞ্চ দুর্ঘটনার জন্য মনের মধ্যে ভয়ের বাতাস ঘুরপাক খাচ্ছে। তারমধ্যে আবার এই লোক আত্মহত্যা নিয়ে আজগুবি কিসব বলছে।
আমি কথা ঘুরিয়ে বললাম, 'ওহ,জানেন তো কদিন আগে এক লঞ্চ এক্সিডেন্টে কত লোক মারা গেল। দেখুন আপনি মরতে না চাইলেও কখনো মৃত্যু এসে হানা দিতে পারে।এমনকি গাড়িতে উঠলে,বোমার আঘাতে পুড়ে যেতে পারেন আপনি। মৃত্যু একটা বাজে ব্যাপার সর্বদাই।'

তিনি একটু হেসে বললেন, 'এমন তো হতে পারে সেই মৃত্যু এসে আপনার পরিবারের সবাইকে গিলে গেয়েছে ,আর আপনি এখানে একা এক ডেকে দাঁড়িয়ে সিগারেট টানছেন।

আমার মুখ বিকৃত হয়ে উঠলো। আমি বুঝতে পারছিলাম না এমন কোন ঘটনা উনার সাথে ঘটেছে কিনা। সে সময় কি করব তা ভেবে কুল পাচ্ছিলাম না। জাহাজ প্রায় চাঁদপুরে এসে পড়েছে। নদীর পাড়ের ব্লকগুলোতে জল উছলে পড়ছে, মৃদু আওয়াজ হচ্ছে। আমার চিন্তারাও পাথরের গায়ে বাড়ি খাচ্ছে। মনে হলো, একটা নদী সোজা আমার ভেতর ঢুকে পড়ছে। আমি অনবরত ভাবছি মৃত্যুর কথা। আহ! মৃত্যু, আহ! চিন্তা। যে নদীতে ডুবে আমাদের আত্মারা নিঃশ্বাস আটকে মারা যায়। আমরা আত্মহত্যা করে চলি অনবরত।

উপরে