ঢাকা, শুক্রবার, ১৬ নভেম্বর, ২০১৮
আংশিক ভুতের গল্প

ভুতেরা মরে গেলে কাক হয়ে যায়।

জুয়েল সেনোবা | আপডেট : ২৯ ডিসেম্বর, ২০১৭ ১০:০১
ভুতেরা মরে গেলে কাক হয়ে যায়।

সবার ছোটবেলাগুলোতে অদ্ভুত কিছু কিছু ধারণা আর বিশ্বাস থাকে। এগুলোর অধিকাংশই সমবয়েসীদের কাছে শোনা বা তাদের থেকে শেখা। রতনেরও এরকম কিছু ধারণা আর বিশ্বাস এখনো আছে। ছোটবেলায় পুরাতন ঢাকার আরমানিটোলায় থাকত ওরা।  আরমানিটোলা মাঠের পূর্বকোনে দুটা স্কুল ছিল। ছিল মানে এখনো আছে।  রতনরা থাকত বেচারাম দেউড়ীতে। বেচারাম দেউড়ী এবং এর চারপাশের সব এলাকার সকল ছেলেপুলেরা মাঠের পূর্বকোনের যে দুটা স্কুল, সেদুটোর কোন না কোনটাতেই পড়ত।  স্কুল ভিন্ন হলেও সমবয়সী সবাই ছিল বন্ধু।  রতনের বন্ধু নয়ন ছিল একটু গম্ভীর ধরণের । ক্লাশ সেভেন এ পড়লেও নয়ন ছিল বাকী সবার চেয়ে একটু বেশী জ্ঞানী। এর কারণ ছিল নয়ন প্রচুর বই পড়ত।  আরমানিটোলা মাঠের পাশেই বাংলাদেশ পরিষদের একটা পাঠাগার ছিল।  নয়ন প্রতিদিন বিকেল বেলা সেখানে বই পড়ত।  রতনের বাকী বন্ধুদের মধ্যে বিশু ছিল একটু ইঁচড়ে পাকা, খুব বানিয়ে বানিয়ে কথা বলত।  যা কিছুই বলত, তার সবই দেখা যেত বানিয়ে বানিয়ে বাড়িয়ে বলছে।  বিশু নিজেও বুঝত না যে, সবাই তার কথা মোটেই বিশ্বাস করছে না এবং সবাই তাকে এজন্যে মুখের উপর চাপাবাজ বলত।   রুবেল ছিল খুব চালাক।  কথাবার্তায় বুঝা যেত না।  কিন্তু রাজ্যের যতো দুস্টামী, সব থাকত তার মাথায়। সারাক্ষণ কাকে কিভাবে হেনস্থা করা যায় সেসব নিয়ে সে রীতিমতো গবেষণা করত।

আরমানিটোলা এলাকাটা তখনো ট্রান্সপোর্টের এলাকা ছিল, এখনো আছে। দিনভর কেবল ট্রাক আর ট্রাক। সেসময়কার দিনগুলোতে অবশ্য ট্রাক কম ছিল। এখনতো দিন রাত চব্বিশ ঘন্টা সে জায়গাটা জ্যাম হয়ে থাকে।

সেই ছোটবেলায় বিশু বানিয়ে বানিয়ে অনেক কিছু বললেও কিছু কিছু জিনিষ, মাথার মধ্যে এক্কেবারে গেঁথে আছে এখনো রতনের। সেগুলো অনেকটা ধারণাগত বিশ্বাস হয়ে গেছে বোধহয়। সকালে বাসায় ফেরার সময় বাসার উল্টা দিকের ডাস্টবিনের পাশে একটা মরা কাক দেখেই বিশুর কথা মনে পড়ে গেল, রতনের।

ছোটবেলায় বিশু বলত, ভূতেরা মরে গেলে কাক হয়ে যায়। কি অদ্ভুত এক কথা। কোথায় যে বিশু এসব পেতো! সাথে সাথে আরেকটা কথা মনে পড়ল। আরমানিটোলায় তখন একটা বিশাল বটগাছ ছিল। পাশে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের, ও নাহ; তখন ওটা কলেজ ছিল। জগন্নাথের একটা হোস্টেলও ছিল। নাম ছিল আবদুর রহমান হল। এই বটগাছের পাশেই জোনাকী ট্রান্সপোর্ট আর তার পাশে একটা হিন্দু হোটেল ছিল, সেটার নামও ছিল বটতলা হিন্দু হোটেল। এই জায়গাটায় কারা যেন দুটা না তিনটা কুকুর পালত। প্রতিদিন সকালে স্কুলে যাবার সময় রতনের রাস্তায় পড়ত কুকুরগুলো। কুকুরকে এমনিতেই খুব ভয় পায় রতন। এখনো। কুকুরগুলোকে পার হওয়া বা পাশ কাটিয়ে যাওয়াটা ছিল একটা ভয়ানক দুঃসাহস এর কাজ। কিন্তু রতন সব সময়েই দেখত, বিশু কোন কিছুর তোয়াক্কা না করে কুকুরগুলোর পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। বিশুর এত সাহস দেখে রতন তাকে রীতিমতো হিংসে করত।এ ব্যাপারটা বিশু অবশ্য বুঝত। পরে সে একদিন রতনকে বলল যে, তুই যদি আমাকে বেলালের চটপটি খাওয়াস, তবে আমি তোকে শিখিয়ে দেব- কিভাবে কুকুরের পাশ দিয়ে হেঁটে যেতে হয়। এমনকি কুকুর যদি পাগলও হয়, তবুও সে নাকি কামড়াবে না। রতন অনেক ভেবে চিন্তে ঠিক করল যে, চটপটি খাওয়ানোটাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। পরে আহমেদ বাওয়ানী স্কুলের সামনে বেলালের দোকানে গিয়ে বিশুকে ফুচকা খাইয়ে সে বুদ্ধিটা শিখে নিয়েছিল রতন। বুদ্ধিটা ছিল এরকম যে, কুকুরের পাশ দিয়ে হাটার সময় ডান হাতের বুড়ো আংগুলের ডগাটা অনামিকার দ্বীতিয় ভাঁজে  ছুয়ে থাকতে হবে। মানে আংগুলে সাত গুনতে গেলে বুড়ো আংগুল যেখানটা ছুয়ে থাকে, সেখানে ছুয়ে হেঁটে যেতে হবে। এতে নাকি কুকুর কখনো কামড়ায় না। আজব এসব জিনিষ বিশু যে কোথায় পেত, এখনো রতন ভেবে পায় না! নয়ন আর রুবেল এগুলো শুনে খুব হাসাহাসি করত। রতনও হাসত। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপারটা অন্যখানে।

রতন এখনো রাস্তায় কুকুর দেখলে হাতের আংগুলগুলোকে সেরকম করে কুকুরের পাশ দিয়ে হেঁটে যায়। রাস্তার কুকুর দেখে সে এখন মোটেই ভয় পায়না। আর মরা কাক দেখলেই মরা ভূতের কথা ভেবে বিশুর কথা মনে পড়ে যায়। এই যেমন এই সকাল বেলাতেই আজ বিশুর কথা মনে পড়ে গেল।

রতন একটা আইটি ফার্মের কর্নধার। নিজে বাংলাদেশের প্রথম সারীর একজন প্রোগ্রামার। বিদেশে কিছুদিন কাজ করে হঠাতই তার মনে হলো বিদেশে এসব পরিশ্রম করে কি হবে? নিজ দেশে চলে এলেইতো হয়। যেই ভাবনা, তেমনিই কাজ শুরু করল। ছয়মাসের মাথায় আমেরিকার পাট চুকিয়ে সোজা ঢাকায়। বউটা প্রথমে গাইগুই করলেও পরে সব মেনে নিয়েছে। বাহিরের একটা বড় কোম্পানীর একটা বড় প্রজেক্টের কাজ করছে সে।

মগবাজারে একটা বড় অফিস করেছে। সারারাত ছেলেরা কাজ করে। দিনের বেলাতেই বরং তার অফিস একটু ঠান্ডা। তাই প্রতিদিন সন্ধ্যার দিকেই সে অফিসে যায়, সারারাত সেখানে থাকে, ভোর বেলা চলে আসে। গত পাচ মাস ধরে এভাবেই যাচ্ছে। সন্ধার পর পর বন্ধুরা আসে, ঘন্টা খানেক থাকে তারপর চলে যায়। সেও সবাইকে বলে দিয়েছে যে, যদি কেউ আসেই, রাত নটার পর থেকে কোন আড্ডা নয়। অফিস মানে কাজ, সে এটা সফলভাবে সবাইকে বুঝিয়ে দিতে পেরেছে এর মধ্যেই। মাঝে মাঝে রাত দুপুরে অনলাইন কিছু ভিডিও কনফারেন্সও করতে হয়। সব মিলিয়ে রাতে অফিস করাটাই এ প্রজেক্ট এর জন্যে সুবিধাজনক বলে রতন নিজেকে মানিয়ে নিয়েছে।

রাত আড়াইটা তিনটার দিকে মাঝে মাঝে রতন অফিস থেকে বেরিয়ে রাস্তায় আসে। মিনিট দশেক হাঁটে। সিগ্রেট খায়। আজও বের হল। বেরিয়ে হাটতে হাটতে মগবাজার রেলক্রসিং এর উপর এসে দাঁড়ালো। রেললাইনের উপর দাড়াতে রতনের বেশ ভাল লাগে। কেমন একটা নিজের মধ্যে থ্রিলিং ভাব আসে। এই ট্রেন লাইন, কত হাজার হাজার মানুষ ট্রেনে করে এদিক ওদিক যায়- সবাই এই লাইন ধরেই চলে।

আচ্ছা, যদি এমন নিয়ম হতো যে, মানুষ যেখানেই যাকনা কেন সবাইকে এই লাইন ধরেই যেতে হবে এবং সবাইকে হেটেই যেতে হবে-  কি অবস্থাটাই না হতো তখন। দিনরাত মানুষে গিজগিজ করত এই লাইনটা। আর ঠিক এই লাইনের উপরেই সে এখন দাঁড়িয়ে আছে। এসব ভাবতে ভাবতে আনমনা হয়ে ট্রেন লাইনের দাঁড়িয়ে রইল রতন।

এত রাতে এখানে কি করছেন? কে যেন জিজ্ঞেস করতেই সম্বিত ফিরে পেল রতন।

ঘাড় ঘুরিয়ে সে দেখল তার পেছনেই একটা লোক, মোটামুটি বেশভুষা। মধ্যবিত্ত চেহারা। এত রাতে এ লোক এখানে কোথা থেকে এল, ভাবনাটা মাথায় আসতেই আবার ভাবল তার মতোই কেউ বুঝি। আশে পাশে কাজ করছে আর এখন বুঝি হাটতে বেরিয়েছে।

-না, মানে এমনিই এলাম। রতন বলল।

এভাবে রেললাইনের উপর দাঁড়াতে নেই। বিশেষ করে রাতের বেলা। লোকটা নির্লিপ্ত কন্ঠে বলল।

অদ্ভুত কথাতো। এটা কেমন কথা। রাতের বেলা এমনিতেই লোকজন নাই, ট্রেন যায় কালে ভদ্রে। তার মধ্যে সমস্যাটা কোথায়? এসব ভেবেই রতন জিজ্ঞেস করল, দাঁড়াতে নেই কেন? এখন তো ট্রেনও নাই, রাস্তায় গাড়িঘোড়া নাই, চারদিকে লোকজনও নাই। এখন এ লাইনের উপর দাঁড়াতে সমস্যা কোথায়?

- না, মানে আপনি আমার চলার পথ আটকে রেখেছেন তো, তাই বললাম। লোকটা নির্লিপ্ত কন্ঠে বলল।

- ওহ, স্যরি, আপনি এখান দিয়ে যাচ্ছিলেন। স্যরি, স্যরি। আমি সরে দাড়াচ্ছি। আপনি যান। রতন বলল।

- না, ভাই। শুধু আমার জন্যে সরে দাড়ালে তো চলবে না। শুধু আমি একা নই। আমার সাথে আরো অনেকেই আছে।

লোকটার জবাব শুনে অবাক হয়ে রতন বলল - ভাই, আমিতো দেখছি আপনি একা লোক। বাকী কাউকে তো দেখছিনা ।

-আপনি একটু সরে গিয়ে দাঁড়ান। তাহলেই দেখতে পাবেন। লোকটার কথা শুনে অবাক হয়ে গেলেও রতন কিছু বলল না। কি মনে করে রেললাইন থেকে নেমে দাঁড়ালো।

একটু পরেই অবাক হয়ে দেখল, কাওরান বাজারের দিক থেকে অনেক অনেক লোক রেললাইন ধরে এগিয়ে আসছে। অবাক হয়ে গেল রতন।

অনেকটা ঠিক এরকমই কিছু একটা না সে ভাবছিল একটু আগে। মগাবাজারের দিক থেকে আসা রাস্তাটায় যেখানে  রেলক্রসিং হয়েছে ঠিক সেখানেই রাস্তার মাঝে সে রেললাইন থেকে সরে ফ্লাই ওভারের নীচে আইল্যান্ডে দাঁড়িয়ে আছে।

যে লোকটা তাকে সরে যেতে বলেছিল, সে কাওরান বাজারের দিকে এগিয়ে গিয়ে সবাইকে ডেকে আনল।

তারপর একটা অপার্থিব ধীর গতিতে সবাই সারীবদ্ধ ভাবে এগিয়ে এল। সবার প্রথমে সেই লোকটা, যে তার সাথে কথা বলেছিল।

সারীবদ্ধ লোকগুলো এগিয়ে আসছে। সে লোকটা যখন তাকে পার হচ্ছিল, কি মনে করে রতন তাকে জিজ্ঞেস করল, আপনারা কারা ভাই? এতরাতে একসাথে কোথায় যাচ্ছেন?

- ভাই আমরা বিভিন্ন সময়ে ট্রেনে কাটা পড়ে মারা গিয়েছিলাম। আমরা তো গাড়িতে উঠতে পারিনা। তাই পায়ে হেঁটে বাড়ি যাচ্ছি। লোকটা বলল।

একথা শুনেই রতনের মাথাটা ঘুরে গেল।
তাহলে কাদের সাথে কথা বলছিল এতক্ষন! এরা তাহলে কেউই মানুষ না!

ঠিক তখুনি মগবাজারের দিক থেকে মাঝরাতের ফাঁকা রাস্তা পেয়ে উর্ধশ্বাসে একটা গাড়ি ছুটে এল। রাস্তার উপর রেললাইনে এতগুলো লোক দেখেও গাড়িটা স্পীড কমালো না। ভৌতিক মানুষগুলো সবাই গাড়িটা দেখে সরে দাঁড়ালেও একজন সরে যেতে পারল না। গাড়ির ধাক্কায় সে মানুষটা ছিটলে এসে রতনের ঠিক পাশেই ছিটকে পড়ল। মাথাটা আইল্যান্ডে ঠুকরে গেল সরাসরি। রতন সাথে সাথে বুঝল- এ তো সাথে সাথেই শেষ। রতন আর সহ্য করতে পারল না। চারদিক অন্ধকার হয়ে এল তার।

জ্ঞান ফিরতেই রতন দেখল সে, অফিসে তার চেম্বারে সোফায় শুয়ে আছে। অফিসের দুজন লোক তার দিকে তাকিয়ে আছে। পাশেই রুবেল আর  নয়নও দাঁড়িয়ে আছে।

- তুই অজ্ঞান হয়ে রাস্তায় পড়ে ছিলি, তোর অফিস থেকে বাসায় জানিয়েছে।তোর বউ আমাদের জানাল। আমরাও এলাম। এখন কেমন বোধ করছিস? নয়ন জিজ্ঞেস করল। নয়ন এখন একজন নামী ডাক্তার।

- ভাল, দোস্ত। রতন বলল।

রুবেল পুলিশের বড় কর্তা। সে তার স্বভাবসুলভ প্রশ্ন করল- কি খেয়েছিলি, বল? আর অজ্ঞান হবার জায়গা পেলিনা। দিনের পর দিন রাত জাগছিস। শরীরের দিকে একটু খেয়াল রাখ। আর শোন, তুই যেখানে অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলি, সেখানেই একটা কাকও দেখলাম, মাথা থেঁতলে ঠিক তোর পাশেই মরে পড়ে ছিল। তোর মনে আছে, ঠিক কখন কি অবস্থায় তুই জ্ঞান হারালি?

রুবেলের কোন প্রশ্ন রতনের মাথায় ঢুকছেনা। মাথা থেঁতলে যাওয়া মরা কাকটার কথা এখন তার মাথায়। ভূতেরা মরে গেলে কাক হয়ে যায়। সেই কবে ছোটবেলায় বিশু বলেছিল।

কোন কিছু না বলে রতন ফ্যাল ফ্যাল করে রুবেল আর নয়নের দিকে তাকিয়ে রইল।

(লেখাটি ২২ মার্চ ২০১৭তে কালের কন্ঠ অনলাইল ভার্সনেও প্রকাশিত হয়েছিল)

উপরে