ঢাকা, শুক্রবার, ১৬ নভেম্বর, ২০১৮
শিশুদের খেলাধুলা

অটিজমে আক্রান্ত শিশুদের খেলাধুলা

Borhan Mahmud | আপডেট : ১৫ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০৮:৪৬
অটিজমে আক্রান্ত শিশুদের খেলাধুলা

সাধারণ শিশুরা যেভাবে খেলাধুলা করে, অটিস্টিক শিশুরা প্রায়শই তাদের চেয়ে একটু ভিন্নতর পদ্ধতিতে খেলে। অনেক সময় খেলনাসহ অটিস্টিক শিশুদের কার্যক্রমকে খেলা বলাও যায় না। সাধারণ শিশুরা একটি খেলনা নিয়ে যে সব একটিভিটি করে, সেসব না করে ঐ একই খেলনা নিয়ে বা তার একটি অংশ নিয়ে অটিস্টিক শিশুটি ঘন্টার পর ঘন্টা বা দিনের পর দিন বসে থাকে, নাড়াচাড়া করে এবং কখনোই সেটি হাতছাড়া করে না। আবার অনেক সময় অটিস্টিক শিশুরা এমন একটি জিনিষ নিয়ে মগ্ন হয়, সেটি হয়ত খেলনার পর্যায়েই পড়ে না। তা হতে পারে একটি বোতলের ছিপি বা এক টুকরো কাগজ বা একটা ছোট সুতা।

আমরা সবাই, শিশুরাতো অবশ্যই খেলাধুলা পছন্দ করে। খেলাধুলার উদ্যেশ্য কি? এর মূল কারণ চারটি ; learning, exercise, stimulation, entertainment. অটিস্টিক শিশুরাও এসব কারণেই খেলাধুলা করে। তারাও শেখার জন্য এবং বুঝার জন্যে, একই সাথে সময় কাটানোর জন্য খেলতে বসে। তবে অটিস্টিক শিশুদের প্রেক্ষাপট ক্ষেত্রবিশেষে ভিন্ন।

একটি খেলনা হেলিকপ্টার নিয়ে বসে বসে তার প্রপেলার ঘুরানো কিছু শিশুর জন্যে খুব এক্সাইটিং আবার অন্য কিছু শিশুর জন্যে তা একঘেয়ে ধরণের হতে পারে। এটি যদি শিশুটির মধ্যে কৌতূহল আনতে পারে, ঘুরছে কেন, বা ঘুরলে উড়ে কেন, বা ঘুরলে প্রপেলার এর পাখা দেখা যায় না কেন- তাহলে এ খেলাটি শিশুটির জন্যে খুব মজার হবে। কাজেই একই সাথে কোন খেলনা যদি আনন্দ এবং স্টিমুলেশন তৈরি করতে পারে, তবে তা খুবই ভাল একটি খেলনা।

একটি প্রশ্ন আসতেই পারে, আমরা কিভাবে খেলনা নিয়ে খেলা শিখি?

এটি আসলে ভাষা শেখার মতো একটি স্কিল, যেটি বয়সের বিভিন্ন পর্যায়ে আমরা শিখে ফেলি। মূলত এটি পারিপার্শিক পরিবেশ থেকে শিশুর সহজাত শিক্ষারই একটি বহিঃপ্রকাশ।

Sensory play.  একে হয়তো অনুভূতিজনীত খেলাধুলা বলা যেতে পারে। এ ধরণের খেলাগুলো শিশুদের একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ে শেখা খেলা। এ সময় তারা তাদের অনুভূতির সাড়া সংক্রান্ত ইস্যুগুলো নিয়ে কগেলে। যেমন শব্দ শুনে তাকাচ্ছে, হাতের কাছে পেলে ধরতে চাচ্ছে, হাতে নিয়ে মুখে দিচ্ছে বা নাকের কাছে নিয়ে গন্ধ শুঁকছে অথবা হাতে নিয়ে নাড়িয়ে নাড়িয়ে শব্দ শুনতে চাচ্ছে। এক্ষেত্রে তার নিজের হাত পায়ের আংগুল, নখ, মায়ের হাত, মায়ের হাতের আংগুল, নখ, মায়ের বা অন্যদের চুল, বা কোন খাবার এর টুকরো বা একটা ঝুনঝুনি বা র‍্যাটলার হতে পারে। আর্লি প্লের সময় যে কোন কিছুই শিশুর খেলনা হতে পারে।

Exploratory play.  একে বাংলায় কি বলা যেতে পারে? এটি শিশুটি বুঝতে পারা শুরু করলে শুরু করে। এ সময় শিশু তার খেলনা নিয়ে বুঝার চেস্টা করে যে, সেই খেলনা দিয়ে কি কি করা যায় বা করা যায় না? হয়ত একটি প্লাস্টিকের বা রাবারের হাতুড়ি দিয়ে সে সারাদিন মাটিতে বাড়ি মারছে। এর মধ্যে একবার একটা বাড়ি তার নিজের গায়ে লাগল এবং হালকা ব্যাথা পেল। এরপর থেকে সে সতর্ক থাকবে যেন হাতুড়ির বাড়ি তার নিজের গায়ে না লাগে। এ সময়ে শিশুরা বিভিন্ন অবজেক্ট বা বস্তুর বিভিন্ন ব্যাবহার আবিষ্কার করে। যেমন চামচ দিয়ে চায়ের কাপে টোকা দিলে টুং টুং শব্দ হয়। কিন্তু চামচ দিয়ে অন্যান্য বস্তুতে আঘাত করলে এরকম টুং টুং শব্দ হয় না।

Symbolic and imaginative play.  শিশুর বড় হতে থাকার সাথে সাথে তার খেলার ধরণ, খেলনার বিষয়ে তার চিন্তা করা শুরু হয়, নির্দিষ্ট কোন খেলনা দিয়ে যা যা করা যায়, সে কাজ আর কি দিয়ে করা যাবে- এসব শুরু করে। এর সাথে শিশুতোষ কল্পনা তো আছেই। সাধারণ একটি শিশু এ পর্যায়ে তার চিন্তা করার ক্ষমতা প্রয়োগ করে এবং নিজে নিজে বিভিন্ন কাজের জন্য বিকল্প দ্রব্য বা খেলনাকে চিহ্নিত করে। যেমন চিরুনিকে মাইক্রোফোন হিসেবে ধরে গান গাওয়া, বাবার জুতো পরে বাবার মতো বড় হওয়া কল্পনা করা, নিজের পুতুলকে গোসল করানো ইত্যাদি। অটিস্টিক শিশুরা এ পর্যায়ের খেলাধুলোতে দূর্বল পারফর্মেন্স দেখায়।

এখন প্রশ্ন আসতে পারে, অটিস্টিক শিশুদের ক্ষেত্রে Playing Skill কিভাবে ডেভেলপ করে?

ভাষার ক্ষেত্রে Echolalia Stage এর কথা মনে আছে? শিশুরা যখন আপনি যা বলছেন, তাই বলার চেস্টা করে, সে স্টেজ এর কথা বলছি। এরকম পর্যায়ে অটিস্টিক শিশুরা খেলাধুলা শেখার সময়ে কখনো আটকে যায় বা ঐ পর্যায়ে আটকে যায়। এর কিছু কারণও আছে। নিম্নে এদের কয়েকটি দেয়া হলো:

১। কিছু কিছু শিশু সেন্সরি সেন্সিটিভিটি পছন্দ করে, তারা হয়ত একটা খেলনায় আটকে যায় বা সেটি নিয়েই বছরের পর বছর খেলতে থাকে। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায় যে, মিউজিক হয়, এরকম একটি খেলনা শিশুটি পছন্দ করে ফেলল। তখন সে ঐ খেলনাটা হাতছাড়া করতে চায়না এবং দিনের পর দিন অষ্টপ্রহর সেটি নিয়েই থাকে। আর কোন খেলনার দিকে সে ফোকাস করে না বা দেখেও না।

২। আবার যারা সেন্সরি এভয়েড করতে চায়, তারা খেলনা ধরেও দেখে না এবং তার দিকে ফোকাসও করে না। এতে খেলনাটির ফাংশনাল বিষয়গুলোও সে দেখে না।

৩। খেলনার বিভিন্ন ফাংশন বের না করার যে প্রবণতা, তার কারণ অনেকটা এরকম দাঁড়ায় যে, সে ট্রিকি বিষয়ের দিকে ফোকাস করতে চাচ্ছে না বা সে মাথা খাটাতে চাচ্ছে না।

৪। দৈনন্দিন রুটিনভিত্তিক জীবনধারা অটিস্টিকদের খুব পছন্দ। নতুন খেলনা তার জীবনধারাকে ব্যাহত করছে, তাই সে নতুন খেলনাকে গ্রহন করছে না।

৫। অটিস্টিক শিশুদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক কমিউনিকেশন ডিজর্ডারে ভোগে। তাই তাদেরকে নির্দেশনাও দেয়া যায় না এবং আবার তারা বোঝেও না।

৬। আবার অটিস্টিক শিশুরা যেটা পছন্দ করে, সেটা ছাড়তেও চায় না। এই রিজিডিটিও তাদেরকে নতুন অবজেক্ট বা একই অবজেক্ট এর নতুন ফাংশন শেখার একটি অন্তরায়।

৭। আবার শিশুটি যদি দ্রুত মনযোগ হারিয়ে ফেলে বা হাইপার ফোকাসিং ধরণের হয়, তখনো তাদের কোন বিষয় বা কোন খেলনা পছন্দ, তা অনেক সময় নির্ধারণ করা যায় না।

৮। একই ধরণের খেলনা নিয়ে খেলতে গিয়ে তারা Exploratory Play তে আগ্রহ নেয় না বলে তারা অনেক সময় একই ধরণের খেলনা নিয়ে লাইন করে সাজায়। যেমন কয়েকটি গাড়ি পেলেও তারা সেগুলোকে না চালিয়ে সেগুলোকে সারী সারী করে সাজিয়ে রাখে। এটি প্রকারান্তরে তাদের ত্রুটিপূর্ণ খেলার ধরণ নয়, বরং অপরিপক্ব খেলার ধরণকে বোঝায়।

এসবের মানে এই নয় যে, তারা খেলা শিখছে না বা তাদের কমপ্লেক্স Play Skill ডেভেলপমেন্ট হচ্ছে না, তারা হয়তো তাদের উপযোগী খেলনাই পায় নি। কিংবা তারা এই খেলার ধরণ শেখার উপযুক্ত হয়নি। তাই তাদেরকে যে খেলনা দেয়া হচ্ছে তা দিয়ে তাদের সীমিত বোধে যেটুকু কুলোচ্ছে, তারা সে মোতাবেকই খেলছে।

উপরে