ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৩ ডিসেম্বর, ২০১৮
শিশুর রক্তশূন্যতার

শিশুর রক্তশূন্যতার কারণ ও সমাধান

20fours Desk | আপডেট : ১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ১১:২৭
শিশুর রক্তশূন্যতার কারণ ও সমাধান

রক্তশূন্যতার প্রধান উপসর্গগুলো হলো শিশুকে ফ্যাকাশে ও দুর্বল দেখায়, ঘুমের পরিমাণ কমে যায়, মেজাজ খিটখিটে হয়, অল্প পরিশ্রমেই হাঁপিয়ে ওঠে এবং শিশুর জিব, নখ, হাতের তালু ইত্যাদি সাদাটে হয়ে পড়ে। ধড়পড়, শ্বাসকষ্ট, সামান্যতেই ক্লান্ত হওয়া, খেলাধুলায় হাঁপিয়ে ওঠা ও হার্টফেলিওর-এর মতো লক্ষ্যণাদি নিয়ে হাজির হয়।

রক্তে হিমোগ্লোবিন বা লোহিত কণিকার পরিমাণ কমে গেলে অ্যানিমিয়া বা রক্তাল্পতা রোগ হয়। তবে বিভিন্ন বয়সে স্বাভাবিক হিমোগ্লোবিনের পরিমাণে তারতম্য থাকে। শিশুর বয়স ও লিঙ্গ অনুযায়ী তা আলাদা হতে পারে।

শিশুর অসুস্থজনিত রক্তস্বল্পতার জন্য প্রধানত আয়রন, ফলিক এসিড, ভিটামিন বি ১২, প্রোটিন ও ভিটামিন ই ঘাটতি মুখ্য কারণ।

রোগ প্রতিরোধ : শিশুর প্রথম ৬ মাস পর্যন্ত মাতৃদুগ্ধ পান, ৬ মাস বয়স হতে শিশুকে ঘরে তৈরি পরিপূরক খাবার খাওয়ানো শুরু করা।

যেসব শিশু স্বল্প ওজন নিয়ে জন্মায় (জন্ম ওজন ২৫০০ গ্রাম এর কম) তাদের ২ মাস বয়স হতে আয়রন যোগান।

প্রতি ৩-৪ মাস অন্তর শিশুকে কৃমির ওষুধ খাওয়ান।

 শিশুকে প্রয়োজনানুযায়ী আয়রন টেবলেট ও ফলিক এসিড প্রদান।

শিশুর প্রতিদিনের খাবারে সবুজ শাকসবজি, ফলমূল ও সল্ট ফোরটিফিকেশন, আয়রন ঘাটতিজনিত রক্তস্বল্পতা দূরীকরণে সাহায্য করে।

রক্তশূন্যতার কারণ

বহুবিধ কারণে রক্তশূন্যতা দেখা দিতে পারে। এগুলোর মধ্যে প্রধান ৩টি কারণ হল:

ক) অস্থিমজ্জায় লোহিত কণিকা কম তৈরি হওয়া। এর কারণগুলো হল:

১. অস্থিমজ্জার স্বল্পতা

২. লৌহ, ভিটামিন বি১২ অথবা ফলিক এসিডের অভাব (মাসিক, গর্ভধারণ, সন্তান প্রসব, দীর্ঘদিন রক্তক্ষরণ)

৩. দীর্ঘস্থায়ী জীবাণু সংক্রমণ, থাইরয়েড গ্রন্থির অসুখ বা লিভারের অসুখ, বিভিন্ন প্রকার ওষুধ সেবন, কীটনাশক ওষুধের ব্যবহার, রঞ্জন রশ্মি বা তেজষ্ক্রিয় রশ্মির প্রভাব ইত্যাদি।

খ) অতিরিক্ত পরিমাণে লোহিত কণিকা ভেঙ্গে যাওয়ার কারণসমূহের মধ্যে জন্মগতভাবে লোহিত কণিকাতে ত্রুটি যেমন:থ্যালাসেমিয়া; অন্যতম।

গ) অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কারণগুলো হল:

১. সাময়িক ও দীর্ঘস্থায়ী রক্তক্ষরণ যেমন: আঘাতজনিত কারণ।

২. পেপটিক আলসার, পাইলস, বক্র কৃমির সংক্রমণ, ঘন ঘন গর্ভধারণ ও প্রসব, মহিলাদের মাসিকের সময় অধিক রক্তক্ষরণ ইত্যাদি

রক্তশূন্যতার মাত্রা বেশি হলে শ্বাস-প্রশ্বাস ও হৃৎস্পন্দনের গতি বাড়তে পারে, শরীরে পানি আসতে পারে এবং মারাত্মক হৃদ্‌রোগের (হার্ট ফেইলিওর) মতো জটিলতাও হতে পারে।

পরিবারের কারও থ্যালাসেমিয়া বা রক্তে অস্বাভাবিক হিমোগ্লোবিনের উপস্থিতি থাকলে শিশুদের ক্ষেত্রে অবশ্যই সেটা খতিয়ে দেখতে হবে।

এ দেশে পরজীবী বা কৃমি সংক্রমণ শিশুদের রক্তাল্পতার একটি প্রধান কারণ। এমনকি সচ্ছল শহুরে পরিবারেও তা হয়। তাই শিশুর খাদ্য ও ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতার দিকে নজর দিতে হবে। শিশুর জ্বর দীর্ঘদিন স্থায়ী হলে, পেট ফুলে গেলে এবং শরীরের ওজন কমে গিয়ে ফ্যাকাশে ভাব দেখা দিলে অবিলম্বে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

রক্তশূন্যতায় করণীয়

রক্তশূন্যতার উপসর্গ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া বাঞ্চনীয়। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী কিছু পরীক্ষা করানো যেতে পারে। যেমন:

ক) রক্তে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা (Hb%)

খ) পেরিফেরাল ব্লাড ফিল্ম (PBF)

গ) অস্থিমজ্জা পরীক্ষা (Bone marrow examination)

ঘ) মাথার এক্স-রে (X-ray of Skull)

ঙ) প্রয়োজন ভেদে কিছু বায়োকেমিক্যাল পরীক্ষা ইত্যাদি।

রক্তশূন্যতার জন্য পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার সময় প্রথমে রোগীর রক্তশূন্যতা প্রকৃতপক্ষে আছে কি-না তা নিরূপণ করতে হয়। যদি রক্তশূন্যতা থাকে তবে রক্তশূন্যতার কারণ যাচাই এর জন্য আরও কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা যেতে পারে। যেমন:

চ) রক্তশূন্যতার উপসর্গের চিকিৎসা

ছ) খাদ্যে যে যে উপাদানের ঘাটতির জন্য রক্তশূন্যতা হয়েছে সে উপাদানের ঘাটতিপূরণ।

জ) যে শারীরিক ত্রুটি বা অসুস্থতার জন্য রক্তশূন্যতা দেখা দিয়েছে সে রোগের চিকিৎসা করানো।

লৌহের অভাবজনিত কারণে রক্তশূন্যতা দেখা দিলে (যেমন— খাদ্যে ঘাটতি, বক্রকৃমির সংক্রামক, পেপটিক আলসার এর রক্তক্ষরণ ইত্যাদি) আয়রন ট্যাবলেট খেতে হবে।

ভিটামিন বি১২ বা ফলিক এসিডের অভাবে উক্ত উপাদানের ঘাটতি পূরণ করতে হবে। যে কোনো কারণেই হোক যদি রক্তশূন্যতা অত্যন্ত প্রকটভাবে দেখা দেয় তবে অল্প সময়ে সাময়িক উন্নতির জন্য রক্ত পরিসঞ্চালন করা জরুরি হয়ে পড়ে এবং এ জন্য হাসপাতালে ভর্তি হওয়া প্রয়োজন। প্রেক্ষাপটে গর্ভবতী ও স্তন্যদায়ী মা এবং শিশুদের অধিকাংশই সাধারণ রক্তশূন্যতার শিকার। রক্তশূন্যতা রোধে গর্ভবতী মা, শিশুদের লৌহসমৃদ্ধ খাবার বেশি করে খেতে দিতে হবে। কালো কচু, ধনেপাতা, কাটা নটে, ডাঁটা শাক, আমচুর, পাকা তেঁতুল, ছোলা শাক, ফুলকপি, আটা, কালোজাম, চিড়া, শালগম, কলিজা, চিংড়ি এবং শুঁটকি মাছেও আয়রন রয়েছে। তাই এগুলো মা ও শিশুকে খেতে দিতে হবে।

গর্ভবতী মাকে গর্ভের চতুর্থ মাস থেকে আয়রন ট্যাবলেট খেতে দিতে হবে। শিশুর কৃমি রক্তশূন্যতার অন্যতম কারণ। তাই কৃমি প্রতিরোধে ব্যবস্থা নিতে হবে।

উপরে