ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৩ ডিসেম্বর, ২০১৮
'জাহাজি কোরমা'

ঢাকাই খাবার এবং হারিয়ে যাওয়া 'জাহাজি কোরমা'

| আপডেট : ৯ নভেম্বর, ২০১৭ ১২:৫৭
ঢাকাই খাবার এবং হারিয়ে যাওয়া 'জাহাজি কোরমা'

ঐতিহাসিকেরা বলছেন, ৪০০ বছর আগে ঢাকা যখন প্রাদেশিক রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি পায়, তারও আগে ঢাকায় জনবসতি ছিল। তাদের খাদ্যতালিকা, রন্ধনপ্রণালি ছিল এক রকম। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ঢাকার আদি খাবারে অন্য সব সংস্কৃতির প্রভাব পড়ে। বহু বিবর্তনের পর খাবারে পরিবর্তন, পরিবর্ধন, সংযোজন-বিয়োজনে নতুন ধারার খাবারদাবার আত্মপ্রকাশ করে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক শরীফ উদ্দীন আহমেদ এক সাক্ষাতকারে বলেন, ঢাকাই খাবার বলে যে খাবারটা প্রচলিত, সেটা মূলত মোগলাই খাবার। তবে এর রকমভেদ আছে। পারস্যের খাদ্যরীতির সঙ্গে ঢাকার খাদ্যরীতির মিশেল ঘটেছে। রান্নার ঢঙে পরিবর্তন এসেছে। পারস্যের রান্নায় যে মসলা ব্যবহার হতো, তার পরিবর্তে দেশীয় মসলা যুক্ত হয়েছে। কালক্রমে তৈরি হয়েছে নতুন এক ধারার খাবার। এটাই ঢাকাই খাবার।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ আবদুল কাইউম ঢাকাবাসীর রসনাবিলাসের ঐতিহ্য সন্ধান করেছেন তাঁর ‘রসনাবৃত্তি: বৈচিত্র্য ও রূপান্তর’ প্রবন্ধে। কোথা থেকে এল ঢাকাই খাবার, সেটি খুঁজতে গিয়ে তিনি উদাহরণ টেনেছেন চর্যাপদ থেকে। তিনি বলেন, প্রাচীন যুগের (অষ্টম-দ্বাদশ শতক) প্রথম সাহিত্যিক নিদর্শন ‘চর্যাপদে’ চালের উল্লেখ আছে, দুগ্ধ ও দুগ্ধপানের কথা উল্লেখ আছে। চতুর্দশ শতাব্দীতে অবহট্ট ভাষায় লেখা ‘প্রাকৃত পৈঙ্গল’ বইয়ের একটি পদে বলা হয়েছে, ‘...যে প্রেয়সী (নিয়মিত) ওগরা বা নরম-গরম ভাত কলার পাতায় গাওয়া ঘি-দুধের সংযোগে মৌরলা মাছের ঝোল ও নালিতা শাক পরিবেশন করে, তার কান্তা বা স্বামী (অবশ্যই) পুণ্যবান।’

ঐতিহাসিকেরা বলছেন, অষ্টম থেকে দ্বাদশ শতাব্দী পর্যন্ত ঢাকায় পাল ও সেনরাজাদের অধীনে জনগণের খাদ্যাভ্যাস ছিল এক ধরনের। বৌদ্ধ ও ব্রাহ্মণ্যধর্মের প্রভাবে ঢাকার খাদ্যতালিকায় প্রাধান্য পায় ভাত ও নিরামিষ। ধীরে ধীরে ভাত, মাছ ও দুধ ঢুকে যায় জনসাধারণের নিয়মিত খাদ্যতালিকায়। প্রাক-মোগল যুগে ঢাকার সুলতানি খাদ্যাভ্যাস ছিল তুর্কি, আরব, ইরানি বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত। তাদের মাংস ও রুটি খাওয়ার অভ্যাস ঢাকার ভাত-মাছের অভ্যাসের সঙ্গে মিশে গিয়েছিল। এরপর আসে মোগলেরা। ঢাকায় সুবেদার ইসলাম খানের বাবুর্চিদের হাতে তৈরি খাবার মোগল খাবার হিসেবে পরিচিতি পায়। ঢাকার রান্নায় ব্যবহূত অনুষঙ্গ যুক্ত হয়ে দিনে দিনে এই খাবারই ঢাকাই খাবার নামে পুরান ঢাকায় প্রচলিত হয়। এসব খাবারের মধ্যে আছে বিরিয়ানি, কাবুলি, খিচুড়ি, শিরবিরঞ্জ, হালিম, বাকরখানি রুটি, চালের গুঁড়ার পিঠা, দোলমাজাতীয় তরকারি। পরে পর্তুগিজ, আর্মেনীয়, ইউরোপীয়সহ বিভিন্ন জাতির আগমনে মোগল চাপাতি রুটির পাশাপাশি পাউরুটি, বিস্কুট, পনির, ছানার মিষ্টি ঢাকাই খাবারের তালিকায় যুক্ত হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উর্দু বিভাগের অধ্যাপক কানিজ ইবতুল গবেষণা করেছেন ঢাকার বিলুপ্ত খাবার নিয়ে। তিনি বলেন, ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের মুনশি মীর আমান দেহেলভির (দিল্লিবাসী) ১৮০১ সালে প্রকাশিত বাগ ও বাহার বইয়ে শাহি নিমন্ত্রণের খাবারের তালিকায় তোররাবন্দি, শবডেগ, মোরগপোলাও, মোরগ মোসাল্লাম, সিশরাঙ্গা (খাগিনা), হালিম, নার্গিসি কোফতা, কাবাব, হারিরা, মাকুতি, মুতানজান, শিরমাল, গাওজাবান রুটি, গাওদিদা রুটি, বাকরখানি রুটি—এমন সব খাবারের নাম পাওয়া যায়। এসব খাবারের অনেকগুলো হারিয়ে গেছে। কিছু টিকে আছে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য নিয়ে।

হারিয়ে যাওয়া একটি প্রচলিত ও জনপ্রিয় খাবার ‘জাহাজি কালিয়া'। গরু বা খাসির হাড়বিহীন মাংস মরিচ ছাড়া জয়তুনের তেলে রান্না করে চীনামাটির পাত্রে করে সঙ্গে নিতেন সমুদ্রপথের যাত্রীরা। ১৫ থেকে ৩০ দিন পর্যন্ত এই মাংস ভালো থাকত। সমুদ্রপথে যাঁরা হজ করতে যেতেন বা ব্যবসার উদ্দেশ্যে আরব, ইরাক, ইরানসহ নানা দেশে যেতেন, তাঁরাই এমন খাবার সঙ্গে নিয়ে যেতেন।

বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে ঢাকাবাসীর কাছে প্রিয় ঢাকাই খাবার। দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বহির্বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে ঢাকাই খাবারের সুখ্যাতি। এখনো রোজার মাসজুড়ে পুরান ঢাকার চকবাজারে চলে ঢাকাই খাবারের বেচাকেনা। কয়েক শ বছরের পুরনো চকবাজারে এখনো বিরিয়ানি, মুরগি মোসাল্লাম, বিভিন্ন জাতের কাবাবের পাশাপাশি শরবত বিক্রি হয়।

'কিংবদন্তির ঢাকা’য় নাজির হোসেন লিখেছেন, ‘ফাতেহা-ই-দোয়াজ দাহম উপলক্ষে বিভিন্ন মহল্লা থেকে বহু লোক মওলুদ (মিলাদ) পড়ার জন্য সমবেত হতেন। অপরাহ্নে বিভিন্ন দলের মধ্যে প্রতিযোগিতা আরম্ভ হত। এই অনুষ্ঠানে প্রৌঢ় ও যুবকেরা অংশগ্রহণ করতেন এবং এ দৃশ্য দেখার জন্য বহু লোক রাস্তা ও মসজিদের বারান্দায় সমবেত হতেন। তা ছাড়া এখানকার পান ও শরবত ছিল অত্যন্ত উৎকৃষ্ট ধরনের। এ জন্যও বহু দূরদূরান্ত থেকে লোক এখানে এসে পান ও শরবত খেয়ে তৃপ্ত হত। এককালে শহরের খোশবাশ বলে পরিচয় দানকারীগণ পান-শরবতের পশরা নিয়ে এখানে জলসার মত আড্ডা জমিয়ে রাখতো।’

কোরবানি ঈদের সময় মাংসের বিভিন্ন পদের রান্নার হিড়িক পড়ে যেত। এবার আসি ঢাকাইয়াদের কোরবানির গোশত দিয়ে বিভিন্ন ধরনের খাবার তৈরির ঐতিহ্যমণ্ডিত দিকটার দিকে। এ খাবারগুলোর গুণকীর্তন করেছেন দেশ-বিদেশের বিদগ্ধজনরাও। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা শিল্পপ্রেমিক শাহেদ সোহরাওয়ার্দী তাঁর দেশ-বিদেশের রান্না নিয়ে লেখা এক গ্রন্থে ঢাকাবাসীর খাবারদাবারকে পৃথিবীর অতুলনীয় সুস্বাদু খাদ্য বলে অভিহিত করেছিলেন। উপমহাদেশের বিখ্যাত চিকিৎসাবিজ্ঞানী, ইতিহাসবিদ, হাকিম হাবিবুর রহমান তাঁর গ্রন্থে ঢাকাইয়াদের নানা ধরনের মাংসজাত দ্রব্যের চমৎকার বর্ণনা দিয়েছেন। কাঁচা গোশতের কোফতা, সিদ্ধ গোশতের কোফতা এবং কাঁচা ও সিদ্ধ গোশতের মিশ্রিত কোফতা, খাশতা কোফতা, কোফতার কালিয়া, কোফতার কোরমা; এমন অদ্ভুত সব কোফতার চমৎকার বর্ণনা দিয়েছেন তিনি। এসব ছাড়াও অনেকে আবার সিনার গোশত দিয়ে বড় বটির কোরমা রান্না করেন। মাংসজাত খাবারের মধ্যে আরো কয়েক পদের খাবার অনেকেই রান্না করেন, যেমন খাসি বা গরুর গোশত দিয়ে বটি কাবাব, কলিজি কাবাব, তিলি্ল ভুনা, গুরদা ভুনা, কিমা, মগজ, নেহারি, কোফতা, চাপ, খাসির কল্লা রান্না, শিক কাবাব ইত্যাদি। এ প্রসঙ্গে সাবেক সংসদ সদস্য ও শিল্পপতি আনোয়ার হোসেনের ‘আমার সাত দশক’ গ্রন্থ থেকেও উদ্ধৃতি দেওয়া যায়। তিনি জানান, ঈদের তৃতীয় দিন, মানে কোরবানি দেওয়ার পরদিন রাতে নিজেরাই শিক কাবাব বানিয়ে গরম গরম পরোটা দিয়ে গলাধঃকরণ করতাম। শিক কাবাব বানানোর সময় মজা হতো খুব।

গরুর কুঁজোর গোশতেও তৈরি হয় এক ধরনের কাবাব। এতে টক দই মেখে অনেকক্ষণ রেখে দিতে হয়। পরে নানা রকম মসলার সহযোগে তন্দুরে বা ওভেনে কাবাব বানানো হয়। খাওয়া হয় পাউরুটি বা বাখরখানির সঙ্গে। কোরবানির রান্না করা গোশত কিভাবে দীর্ঘদিন রেখে খাওয়া যায়, তার পদ্ধতিও জানা ছিল ঢাকার রাঁধুনিদের। তখন কোরবানির গোশত দীর্ঘদিন ঘরে রেখে মহররমের আশুরার দিন রান্না করা খিচুড়ির সঙ্গে পরিবেশন করা হতো। কেউ কেউ আবার ঈদে মিলাদুন্নবী পর্যন্ত গোশত সংরক্ষণ করতেন। এসব বর্ণনা থেকেই জানা যায়, ঢাকাইয়ারা উদ্ভাবনী শক্তি আর রন্ধনকলায় অসাধারণ দক্ষতা অর্জন করেছিলেন।

(ছবিটি প্রতীকী এবং তথ্যগুলো বিভিন্ন পত্রিকা ও গ্রন্থ সূত্রে প্রাপ্ত। সংকলক বোরহান উদ্দিন মাহমুদ)

উপরে