ঢাকা, বুধবার, ১৯ ডিসেম্বর, ২০১৮
ঢাকায় ঘোড়দৌড়ের দিনগুলো

ঢাকায় ঘোড়দৌড়ের দিনগুলো

| আপডেট : ৯ নভেম্বর, ২০১৭ ১২:৪৬
ঢাকায় ঘোড়দৌড়ের দিনগুলো

১৮২৫ সালের দিকে ঢাকার তদানিন্তন ম্যাজিস্ট্রেট চার্লস ডস ঢাকায় ঘোড়দৌড় প্রবর্তন করেন।

ঢাকার নওয়াবদের আনুকূল্যে একসময় ঘোড়দৌড় ঢাকায় খুবই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। তবে ঢাকার নবাব গনির সময়ে উনিশ শতকের ষাটের দশকে এটি বিশেষ জনপ্রীয় হয়ে উঠে। এখানে বিশ শতকের প্রথম কয়েক দশক পর্যন্ত এই ঘোড়দৌড় চালু ছিল। ১৮৬৪ সালের ‘ঢাকা প্রকাশ’ এ প্রকাশিত এক সংবাদের জানা যায় যে, সেকালে সপ্তাহে চারদিন ঘোড়দৌড়ের বাজি হতো। এ উপলক্ষে অফিস আদালতও বন্ধ থাকত। শনিবার একেবারেই বন্ধ। মংগল ও বৃহস্পতিবার অর্ধবেলা বন্ধ। ঘোরদৌড়ের এই বাজীখেলায় ঢাকার বহু দরিদ্র ও নিম্নবিত্ত লোকেরা সর্বস্বান্ত হয়েছে। এই ঘোড়দৌড় ছিল ইংরেজ সাহেব-সুবাদের কাছে অবসর বিনোদন, আর নিরীহ নিঃস্ব ঢাকাবাসীদের কাছে ছিল ভাগ্য বিড়ম্বনা।

ঘোড়দৌড়ের ঘোড়া হতো বেশ তাগড়া এবং এ ধরনের ঘোড়াকে বিশেষ যত্ন করা হতো। এসব ঘোড়ার খাদ্যতালিকায় রাখা হতো খড় বিচালি আর ছোলা। ঘোড়াকে গোসল করিয়ে খড় দিয়ে ঘষে ঘষে শরীর মসৃণ ও চকচকে করা হতো। ঘোড়দৌড়ের আগে ঘোড়ার পায়ের খুড়ায় বিশেষ ধরনের লোহার নাল লাগানো হতো। একশ্রেণির কামার এই নাল বানাতে দক্ষ ছিল।

ঘোড়দৌড়ের ঘোড়া খুব দামি হতো। নবাববাড়ির সদস্য এবং ঢাকার ধনী অভিজাতরা এসব ঘোড়ার ক্রেতা ছিলেন। ঘোড়া রাখার অশ্বশালা বা ঘোড়াশালকে ঢাকার মানুষ বলত ‘আড়গাড়া’। পুরান ঢাকার অনেক স্থানে আড়গাড়া গড়ে ওঠার কথা জানা যায়। এন পি পোগজ ছিলেন ঢাকার পোগজ স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা। তাঁর বাসা ‘সুধাময় হাউসে’র অবস্থান ছিল বর্তমান আরমানিটোলায়। এই বাড়ির উত্তর দিকে একটি বড় আড়গাড়া ছিল। বেশির ভাগ ঘোড়ার মালিক নিজস্ব অশ্বশালা তৈরি করতেন।

ঘোড়ার দেখাশোনার দায়িত্ব পালন যিনি করতেন, তাঁকে বলা হতো ‘সহিস’। অনেকে অতিরিক্ত সহিস না রাখলে কোচোয়ানরাই সহিসের দায়িত্ব পালন করতেন। সহিস ছাড়াও ঘোড়দৌড়ের সঙ্গে আরেকটি পেশাজীবী জড়িত ছিল। তাঁরা ছিলেন পেশাদার অশ্বারোহী। ইংরেজিতে বলা হতো ‘জকি’। ঘোড়দৌড়ের দিন তাঁরা রঙিন পোশাক পরে ঘোড়ায় চড়তেন। জকির ঘোড়া পরিচালনা করার ওপর জেতার সম্পর্ক ছিল। জকিদের বা ঘোড়ার পিঠে থাকত বিশেষ নম্বর। এই নম্বরের ওপরই বাজি ধরা হতো।

ঘোড়দৌড়কে ঘিরে আরেকটি পেশাজীবীর উদ্ভব হয়। তাঁরা ছিলেন এক ধরনের ছোট পুস্তিকার ফেরিওয়ালা। ঘোড়দৌড়কে ঘিরেই এই পুস্তিকা প্রস্তুত করা হতো। ঘোড়দৌড় সম্পর্কে নানা রকম ‘রেস-টিপস’ থাকত এখানে। তাই মুখে মুখে পুস্তিকাটি ‘রেসটিপ’ নামে পরিচিত হয়ে যায়। শনিবারের ঘোড়দৌড়টি ছিল সবচেয়ে জাঁকালো। এদিন রেসটিপস ফেরিওয়ালাদের ছোটাছুটি বেড়ে যেত। তাঁরা ঘুরে ঘুরে রেসটিপস বিক্রি করতেন। এই রেসটিপসগুলোতে সাধারণত যেসব বিষয় থাকত তার মধ্যে ছিল বিভিন্ন অঞ্চলে ঘোড়দৌড় প্রতিযোগিতার তালিকা, ঘোড়ার জকিদের নাম, এখানে সম্ভাব্য বিজয়ীদের নামের পূর্বাভাসও দেওয়া হতো।

পুরান ঢাকার জিমখানা ক্লাব ঘোড়দৌড় পরিচালনার প্রধান ভূমিকা পালন করত। এই ক্লাব থেকেও একটি রেসটিপস বের করা হতো। তা ছাড়া ‘চান মিয়া সাহেবের রেসটিপস’ নামে আরো একটি জনপ্রিয় রেসটিপস ছিল। একসময় এই চান মিয়া সাহেব পৌরসভার কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন।

ইংরেজ শাসনামলে ইউরোপীয়রা নিজের সংস্কৃতির ঘোড়দৌড় চালু করে। ক্রমে এই খেলায় দেশি অনেকে যুক্ত হতে থাকে। আনন্দের পাশাপাশি খেলাটি একসময় জুয়াখেলার মতো নেশায় পরিণত হয়। টাকার বিনিময়ে ঘোড়ার ওপর বাজি ধরা হতো। এই নেশায় ঢাকাবাসী অনেক ধনী ও মধ্যবিত্ত পরিবারের নিঃস্ব হয়ে যাওয়ার কথা  জানা যায়।

ঘোড়দৌড়ের মাঠে ঘোড়ার দৌড়ের জন্য কাঠের রেলিং দিয়ে রো আলাদা করা হতো। ঘোড়দৌড় বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরও রেসকোর্স ময়দানে অনেক দিন পর্যন্ত কাঠের রেলিং টিকে ছিল।

ছবিগুলো ইন্টারনেট থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে।

উপরে