ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৩ ডিসেম্বর, ২০১৮
ঢাকার প্রথম মেস

ঢাকার প্রথম মেস

| আপডেট : ৯ নভেম্বর, ২০১৭ ১২:৩৮
ঢাকার প্রথম মেস

ব্যাচেলরদের থাকার জন্য এক সময় ঢাকায় অসংখ্য মেস থাকলেও সেগুলো কালের গর্ভে হারিয়ে গেছে। এমনকি সেসবের নাম-ঠিকানাটুকুও জানা যায় না।
তবে ইতিহাস ঘেঁটে নগরীর সবচেয়ে পুরনো বেশ কয়েকটি মেসের সন্ধান পাওয়া গেছে। এর মধ্যে একটিতে বাস করত অবিবাহিত ব্রিটিশ সিভিলিয়ানরা। অন্য একটিতে থাকত দেশের প্রথম ইংরেজি বিদ্যাপীঠ ঢাকা কলেজিয়েট স্কুলের শিক্ষার্থীরা। সিভিলিয়ানদের মেসের নাম ছিল চামেরী হাউস। আর কলেজিয়েট স্কুলের মেসটির নাম ছিল ঢাকা হিন্দু ছাত্র হোস্টেল। বেসরকারিভাবে ঢাকার প্রথম ছাত্র হোস্টেলের নাম ছিল রাজচন্দ্র ছাত্র হোস্টেল। নামে ছাত্র হোস্টেল হলেও বাস্তবে সেগুলো ছিল একেকটি মেস।

ঢাকা বিশেষজ্ঞ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক ড. মুনতাসীর মামুনের বিবরণ থেকে জানা যায়, জাতীয় প্রেস ক্লাবের পশ্চিম পাশে বর্তমান সিরডাপ মিলনায়তন ব্রিটিশ আমলে চামেরী হাউস নামে খ্যাত ছিল। যেসব অবিবাহিত ব্রিটিশ সিভিলিয়ান চাকরি নিয়ে ঢাকায় আসতেন তাঁদের থাকা-খাওয়ার জন্য তৎকালীন প্রশাসন রমনার ১০ নম্বর বাংলোবাড়িটি বরাদ্দ করেছিল। সেখানে সিভিলিয়ানরা পরস্পর বন্ধুর মতো বসবাস করতেন। ইংরেজিতে চাম শব্দের অর্থ বন্ধু। তা থেকেই চামেরী হাউস নামের উৎপত্তি।

চামেরী হাউসের সঙ্গে ঢাকার আরো কিছু ইতিহাস জড়িয়ে আছে। ওই হাউসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ছাত্রীনিবাস গড়ে উঠেছিল। পরবর্তী সময়ে ওমেন্স হোস্টেল নামে এটি পরিচিতি লাভ করে। ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে ওঠার পর তাদের কোনো ছাত্রীনিবাস ছিল না। এ কারণে কর্তৃপক্ষ চামেরী হাউসকে ছাত্রীদের মেস বানাতে বাধ্য হয়। চামেরী হাউসের উত্তর পাশে ছিল রমনা হাউস, যা বর্তমানে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে। এখানকার স্থাপনাটি এক সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেস হিসেবে ব্যবহার হয়েছে। এমনকি ঐতিহাসিক বর্ধমান হাউসটি এক সময় ছাত্রদের মেস বানানো হয়। পরবর্তী সময়ে ভবনটি শিক্ষকদের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়। ওই ভবনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এবং প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ ড. রমেশচন্দ্র মজুমদার থাকতেন। ১৯২৬ সালে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমন্ত্রণে ঢাকায় এসে বুড়িগঙ্গার বুকে তুরাগ হাউসবোটে থেকেছেন। তখন দাওয়াত খেতে কবিগুরু বর্ধমান হাউসে এসেছিলেন।

১৮৩৫ সালের দেশের সর্বপ্রথম ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ঢাকা কলেজিয়েট স্কুল এবং ১৮৪১ সালে ঢাকা কলেজ প্রতিষ্ঠার পর সেখানে ছাত্র-শিক্ষকদের থাকার নিজস্ব কোনো স্থাপনা ছিল না। ঢাকার বাইরে থেকে আসা ছাত্রদের নিজ অর্থ ও ব্যবস্থাপনায় বসবাস করতে হতো। ড. শরীফ উদ্দিন আহমেদ তাঁর ‘ঢাকা কলেজের ইতিহাস ও ঐতিহ্য’ (১৮৪১-১৯২১) গ্রন্থে বলেন, ‘বাইরে থেকে পড়তে আসা ছাত্রদের প্রথমেই সবচেয়ে কঠিন সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়েছিল থাকার জায়গা নিয়ে। ১৮৩০ বা ১৮৪০-এর দশকে ঢাকা গভর্নমেন্ট স্কুল বা ঢাকা কলেজ কর্তৃপক্ষ বহিরাগত ছাত্রদের বাসস্থানের জন্য কোনো ছাত্রাবাস নির্মাণ বা অনুরূপ কোনো ব্যবস্থাই গ্রহণ করেনি। ১৮৭৪ সালে ঢাকায় একটি ছাত্রাবাস স্থাপিত হলেও নানা কারণে সে ছাত্রাবাস বেশি দিন চলেনি। ’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার গিরিশ চন্দ্র নাগ জগন্নাথ ও ঢাকা কলেজের ছাত্র ছিলেন। তিনি টাঙ্গাইল গ্রাহাম স্কুল (পরে বিন্দুবাসিনী স্কুল) থেকে এন্ট্রান্স পাস করে স্কলারশিপ নিয়ে ১৮৮৭ সালে ঢাকা কলেজে ভর্তি হন। তখন থেকেই তাঁর মেস জীবন শুরু হয়, যা তিনি পরবর্তী সময়ে তাঁর স্মৃতিকথায় উল্লেখ করেন।

তবে ঢাকায় প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সর্বপ্রথম মেস চালু হয় ১৮৭৪ সালে। পাটুয়াটুলীতে ঢাকা ব্রাহ্মসমাজের ভেতরে ছাত্রদের জন্য মেসটি প্রতিষ্ঠা করেন ব্রাহ্মসমাজের সাধারণ সম্পাদক আনন্দবন্ধ মল্লিক এবং ঢাকা বিভাগীয় কমিশনারের ব্যক্তিগত সহকারী অভয়চন্দ্র দাস। এই মেসে থেকে লেখাপড়া করত ব্রাহ্মসমাজ প্রতিষ্ঠিত ব্রাহ্ম স্কুল, জগন্নাথ স্কুল, কে এল জুবিলী স্কুল, ঢাকা কলেজিয়েট স্কুল, পোগজ স্কুল এবং ঢাকা কলেজের ছাত্ররা। সরকারি অনুদান পেতে কর্তৃপক্ষ মেসটির নামকরণ করে ‘ঢাকা হিন্দু ছাত্র হোস্টেল’। হোস্টেল হিসেবে এর নামকরণ করা হলেও সেখানে মূলত মেস পদ্ধতিতেই ছাত্র ভর্তি করা হতো। হোস্টেলের ছাত্রদের কাছ থেকে মাসে মেস ফি হিসেবে পাঁচ থেকে আট টাকা পর্যন্ত নেওয়া হতো। এর মধ্যে সরকার ছাত্রপ্রতি মাসিক আট আনা ভর্তুকিসহ হোস্টেলের জন্য বছরে ৫০০ টাকা অনুদান দিত।

‘ঢাকা ব্রাহ্মসমাজের ইতিবৃত্ত’ গ্রন্থ সূত্রে জানা যায়, হিন্দু ছাত্র হোস্টেলে মোট চার ধরনের বোর্ডার বা সদস্য থাকত। কে কোন ধরনের রুম ব্যবহার করবে এবং কী ধরনের খাবার খাবে এর ওপর নির্ভর করে বোর্ডারের শ্রেণিকরণ করা হতো। চার ধরনের রুম বরাদ্দ করার ফি নির্ধারণ ছিল পাঁচ, ছয়, সাত ও আট টাকা। এই টাকার অন্তর্ভুক্ত ছিল থাকা, খাওয়া, মেস ব্যবস্থাপক ও কাজের লোকদের বেতন-ভাতাসহ আনুষঙ্গিক খরচাদি। প্রতিষ্ঠার প্রথম বছরই হোস্টেলটিতে ৩৬ জন সদস্য ভর্তি হয়। তাদের মধ্যে কয়েকজন ছিল ঢাকা কলেজের ছাত্র। যাদের বাড়ি ঢাকা থেকে দূরে ছিল, মূলত তারাই ওই হোস্টেলের সদস্য হতে পারত।

ফরাশগঞ্জের জমিদার, ঢাকার ধনাঢ্য ব্যাংকার ও রূপলাল হাউসের মালিক প্রতাপচন্দ্র দাস ছিলেন ঢাকার প্রথম ছাত্রাবাসের জনক। ছাত্রদের আবাসনের প্রচণ্ড সংকটে তিনি ত্রাণকর্তারূপে হাজির হন। তবে ছাত্র হোস্টেল নির্মাণের ক্ষেত্রে তাঁর অন্যতম শর্ত ছিল, এর নাম রাখতে হবে তাঁর বাবা রাজচন্দ্রের নামে। দ্বিতীয় শর্ত ছিল, ওই হোস্টেলে শুধু হিন্দু ছাত্ররা থাকতে পারবে। ১৮৮০ সালের ২৮ জানুয়ারি প্রতাপচন্দ্র ঢাকা কলেজের তৎকালীন অধ্যক্ষকে একটি চিঠি লেখেন। চিঠি সূত্রে জানা যায়, হোস্টেলটি নির্মাণের জন্য যে অর্থ ব্যয় হবে তার পুরোটাই তিনি দেবেন। একই সঙ্গে তিনি হোস্টেল পরিচালনার জন্য বার্ষিক ৬০০ টাকা অনুদান দেবেন। সরকারি অনুমোদন পাওয়ার পর ১৮৮০ সালেই বাংলাবাজারের শ্রীশদাস লেনে হোস্টেলটি চালু হয়।

১৮৯০ সালের দিকে চালের মূল্য অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পেলে জমিদার প্রতাপচন্দ্র দাস হোস্টেলের অনুদান ৬০০ টাকা থেকে বৃদ্ধি করে ৯০০ টাকা করেন। ১৯০০ সালের দিকে প্রতাপচন্দ্র দাসের মৃত্যু হলে অনেকে ধারণা করেছিলেন হোস্টেলটি বন্ধ হয়ে যাবে। কিন্তু তা হয়নি। প্রতাপচন্দ্রের ছেলে শিরিশচন্দ্র দাস বাবার মতোই হোস্টেলের অভিভাবক হিসেবে কাজ শুরু করেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এবং ঢাকা কলেজিয়েট স্কুলের ছাত্র প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ ড. রমেশচন্দ্র মজুমদারের স্মৃতিচারণা থেকে জানা যায়, তিনি রাজচন্দ্র হিন্দু হোস্টেলের সদস্য ছিলেন। একটা ছোট ঘিঞ্জি গলির মধ্যে দোতলা বাড়ির দোতলায় এক সারি ঘর। প্রথম শ্রেণি একতলার দুই পাশে, দুই সারির ঘর দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণি এবং এই দুই সারির মাঝে এক সারি ঘর চতুর্থ ও তৃতীয় শ্রেণির। ঘরের মধ্য দিয়েই আরেক ঘরে যেতে হতো। চারদিকই বন্ধ। সুতরাং আলো-বাতাস ঢোকার রাস্তা ছিল না। এই চার শ্রেণিতে থাকা-খাওয়ার মাসিক চার্জ ছিল যথাক্রমে আট, সাত, ছয় ও পাঁচ টাকা। সব শ্রেণির খাওয়া ছিল একই। তবে প্রত্যেকের নিজের নিজের থালা দিতে হতো—তার পেছনে নাম খোদাই করে লেখা থাকত। রাত ৮টায় হোস্টেলের গেট বন্ধ হয়ে যেত।

সূত্র: কালের কন্ঠ ২৯ আগস্ট, ২০১৬।
ছবি : ইন্টারনেট

উপরে