ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৩ ডিসেম্বর, ২০১৮
ঢাকাইয়া কুট্টি

'কুট্টি' শব্দটির উৎস এবং ঢাকাইয়া 'কুট্টি' সম্প্রদায় কারা?

| আপডেট : ৯ নভেম্বর, ২০১৭ ১২:৩৪
'কুট্টি' শব্দটির উৎস এবং
ঢাকাইয়া 'কুট্টি' সম্প্রদায় কারা?

হাকিম হাবিবুর রহমান রচিত ‘ঢাকা পাচাশ্ বারস্ পহেলে’, এস এম তাইফুর রচিত ‘Glimpses of old Dacca’, নাজির হোসেন রচিত ‘কিংবদন্তির ঢাকা’, হাফিজা খাতুন রচিত ‘Dhakaiyas on the Move’, বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি থেকে প্রকাশিত গ্রন্থ ফিরোজা ইয়াসমীন সম্পাদিত ‘ঢাকাই উপভাষা প্রবাদ-প্রবচন কৌতুক ছড়া’, আবদুল মমিন চৌধুরী ও শরীফ উদ্দিন আহমেদ সম্পাদিত ‘রাজধানী ঢাকার ৪০০ বছর ও উত্তরকাল’; প্রথম খণ্ড শরীফ উদ্দিন আহমেদ সম্পাদিত ‘ঢাকা কোষ’, বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত আনিস আহমেদ রচিত ‘ঢাকাইয়া আসিল’, মালিক খসরু পিপিএম রচিত ‘আন্ধা মিয়ার ঢাকা শহরের বুলির বাজার’ ইত্যাদিসহ আরও বেশ কিছু গ্রন্থে আদি ঢাকার বিভিন্ন সম্প্রদায় বিশেষত কুট্টি ও সুখবাস বা ছোব্বাছি জনগোষ্ঠীর উদ্ভব-উৎপত্তি ও বিকাশ নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।

এ সকল গ্রন্থ পর্যালোচনা করে জানা যায়, মুঘল আমলে মূলত কুট্টি সম্প্রদায়ের উৎপত্তির কাল। আঠারো শতকের মধ্যভাগ থেকে পূর্ববঙ্গে চাল একটি গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি পণ্য ছিল এবং সুবে বাংলার রাজধানী ঢাকা ব্যবসা-বাণিজ্যের বিরাট কেন্দ্রে পরিণত হয়। চাল রপ্তানিকারকরা ছিল মাড়োয়ারি ও ভারতের মধ্য অঞ্চলের মানুষ। তারা পূর্ববঙ্গের বিভিন্ন এলাকা থেকে ধান সংগ্রহ করত। সংগ্রহ করা বিপুল ধান ঢেঁকিতে ভানতে বা কুটতে হতো। এই ধান ভানা বা কোটার কাজে প্রচুর শ্রমিক নিয়োগ করতে হতো। এসব ধান কুটতে ঢাকার আশপাশ এলাকা থেকে শ্রমিক আসত এবং তারা আশেপাশেই থাকতে শুরু করল। যেহেতু ঐসব মেহনতি মানুষ কাজ করছে, একসঙ্গে থাকছে, গল্প করছে, সুখ-দুঃখ বিনিময় করছে, তারা নিজেদের মধ্যে কথা বলতে বলতে একটি ভাষার জন্ম দিল। ধান কুটতে কুটতে তাদের আসল নাম ফেলে দিয়ে মাড়োয়ারিরা সংক্ষেপে ‘কুট্টি’ হিসেবে ডাকতে শুরু করলে, কালের পরিক্রমায় তারা ‘কুট্টি’ হিসেবেই পরিচিতি অর্জন করে। অর্থাত্ ধান কোটার কোটা থেকে ‘কুট্টি’ শব্দ বা সম্প্রদায়ের উত্পত্তি।

এখানে একটি কথা উল্লেখ করা উচিত যে, রাজধানী ঢাকার শহুরে সম্প্রদায়ে একটি সনাতন সামাজিক বর্গ হিসেবে কুট্টিদের উদ্ভবের মূলে ছিল ১৭৬০ খিস্ট্রাব্দ থেকে নিরবিচ্ছিন্নভাবে সংঘটিত প্রাকৃতিক দুর্যোগ। ১৭৬২ খ্রিস্টাব্দের এপ্রিল মাসে ঢাকায় সংঘটিত প্রচণ্ড ভূমিকম্পের ফলে বিরাট সংখ্যক লোক মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়।
আবার ১৭৬৯—১৭৭০ খ্রিস্টাব্দে বাংলাদেশে ব্যাপক দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। তখন নাসিরাবাদ [ময়মনসিংহ], কুমিল্লার সুধারাম [নোয়াখালী], জালালপুর [ফরিদপুর], মুন্সিগঞ্জ ও অন্যান্য এলাকা হতে দরিদ্র শ্রেণির লোকজন জীবিকার জন্যে ঢাকায় এসে ভিড় জমায় এবং ধোলাইখাল এলাকায় বসতি স্থাপন করে। এদের প্রধান কাজ ছিল ধান কুটে চাল বের করা এবং যে সকল জমিদার ঢাকায় বসবাস করতে আসতেন, তাদের দালান-কোঠা তৈরীর জন্য প্রয়োজনীয় ইট ভেঙ্গে দেওয়া। সেই ইট ভাঙা বা কোটার কাজও করত ঐ শ্রমিকেরা। তাদের কোটা থেকে ‘কুট্টি’ শব্দের উদ্ভব এবং এ নামে এ পেশাজীবী গোষ্ঠী সমাজে তৈরি হয়।

এক প্রবন্ধে অধ্যাপক রঙ্গলাল সেন হাফিজা খাতুন রচিত Dhakaiyas on the Move গ্রন্থের বিবরণ উল্লেখ করেন, ‘হাফিজা খাতুন মুঘল শহর ঢাকার অন্যতম আদি বাসিন্দা হিসেবে কুট্টিদের উৎপত্তির উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে আঠারো শতকের মধ্যভাগ থেকে পূর্ববঙ্গে চাল একটি গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি বাণিজ্যের পণ্যে পরিণত হয়। ঢাকা ধান-চাল ব্যবসার বিরাট এক কেন্দ্র হয়ে ওঠে। চাল রপ্তানিকারকরা সকলেই ছিল মাড়োয়ারি ও ভারতের মধ্যাঞ্চলের ব্যবসায়ী। তারা পূর্ববঙ্গের বিভিন্ন জেলার অভ্যন্তর থেকে ধানচাল সংগ্রহ করত এবং ধান ভানার কাজে স্থানীয় বিপুল সংখ্যক শ্রমিক নিয়োগ করত। এসব ধান ভানার লোকেরাই সময়ের আবর্তে কুট্টি নামে অভিহিত হয়।

কুট্টিদের আত্মপ্রকাশ ও ভাষার বিকাশ সম্পর্কে নাজির হোসেন তাঁর কিংবদন্তির ঢাকা গ্রন্থের ভূমিকায় আরও পরিষ্কার ধারণা দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, ‘মোগল আমলে ঢাকাবাসীদের মধ্যে যারা মোঘল শাহীর অধীনে চাকরি করতেন অথবা জমিদার কিংবা ব্যবসা সংক্রান্ত ব্যাপারে জড়িত ছিলেন তারা নিজেদের উঁচু স্তরের লোক ভাবতেন। তৎকালে যন্ত্রের কোনো প্রচলন ছিল না। মানুষকে নিজেদের চাহিদা মেটাবার সব রকম উপকরণ হাতেই তৈরী করতে হতো। এইসব পেশাজীবীদের অনেকেই ধান কুটতো, যব কুটতো, ডাল কুটতো, ডাল কুটতো, সুরকি কুটতো, ইট কুটতো অর্থাত্ যে কোনো ধরনের কুটার কাজ যারা করতেন, তারা ছিলেন খুবই দরিদ্র। ...অন্যদিকে তারা কুটার কাজ করতেন বলে শহরের উঁচু স্তরের লোকেরা এইসব কোটার সঙ্গে যুক্ত মানুষদের ‘কুটিয়াল’ বলতো। কিন্তু কথ্যভাবে তাদের কুট্টি বলেই ডাকতেন।

এই পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি থেকে প্রকাশিত ঢাকা কোষ গ্রন্থে অনুপম হায়াত্-এর লেখা আর একটি টীকা— ঢাকার এক প্রাচীন অধিবাসীদের ‘কুট্টি’ নামে অভিহিত করা হয়। কুট্টি শব্দটি এসেছে ধান কুটা বা ধান ভাঙা থেকে। ঢেঁকির মাধ্যমে ধান হতে চাল ও তুষ আলাদা করার পদ্ধতির নাম ‘ধানকুটা’। ধান কুটে জীবন যাপন করত বলে এদেরকে ‘কুট্টি’ বলা হয়।

কুট্টি একটি পেশাজীবী সম্প্রদায়। পেশাই যে কালে কালে সামাজিক পরিচিতির ধারক হতে পারে, তার ভূরি ভূরি প্রমাণ ইতিহাসে আরো রয়েছে।

উপরে