ঢাকা, শুক্রবার, ১৬ নভেম্বর, ২০১৮
নীরব ঘাতক উচ্চ রক্তচাপ

নীরব ঘাতক উচ্চ রক্তচাপ

20fours Desk | আপডেট : ৭ নভেম্বর, ২০১৮ ২১:১৮
নীরব ঘাতক উচ্চ রক্তচাপ

হাইপার টেনশন বা উচ্চ রক্তচাপকে বলা হয়ে থাকে নীরব ঘাতক। কারণ এটি এমন একটি রোগ যা কোনো পূর্বাভাষ দেয় না এবং ধীরে ধীরে আমাদের মেরে ফেলতে পারে। পৃথিবীতে প্রতি আটজনের মৃত্যুর মধ্যে একজনের মৃত্যু ঘটে উচ্চ রক্তচাপজনিত কারণে। তাই আমদের সকলের উচিত এই রোগটি সম্পর্কে জানা। আসুন তবে আজ জেনে নিই উচ্চ রক্ত সম্পর্কে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য যা আমাদের এই রোগ থেকে বাঁচতে সাহায্য করবে।

উচ্চ রক্তচাপ কি এবং এর কারণঃ
আসলে আমাদের শরীরে রক্তবাহী শিরার চাপ স্বাভাবিকের চেয়ে যখন অনেক বেড়ে যায় এবং তা স্থায়ী হয় তখন তাকে উচ্চ রক্তচাপ বলে। আমাদের স্বাভাবিক রক্তচাপ ১২০/৮০ মিলিমিটার। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে উচ্চরক্ত চাপের কারণ জানা যায় না। খুব অল্প সংখ্যক লোকের ক্ষেত্রেই উচ্চরক্ত চাপের কারণ জানা যায়। আর যাদের কারণ জানা যায় সেই কারণগুলোর চিকিৎসা সঠিকভাবে করা যায় না। তবে সবচেয়ে বড় বিষয় হলো উচ্চ রক্তচাপের  কারণ যাই হোক না কেন একে নিয়ন্ত্রণ করা মোটেও অসম্ভব কিছু নয়। যেহেতু বেশিরভাগ ক্ষেত্রে উচ্চরক্ত চাপের কারণ জানা যায় না তবুও চিকিৎসকরা এর কিছু সম্ভাব্য কারণ বের করেছেন। এর মধ্যে অন্যতম হলো বংশগত কারণ। বংশগত কারণে বাবা-মায়ের উচ্চ রক্তচাপ থাকলে ছেলেমেয়েদের উচ্চ রক্তচাপ হতে পারে। তবে তা হবেই, একথা বলা যাবে না। এছাড়াও অলস জীবনযাপন, মানসিক উত্তেজনা, দুশ্চিন্তা, অতরিক্ত মদপান এসব কারণে উচ্চ রক্তচাপ হতে পারে। একই সাথে যারা ডায়াবেটিস বা কিডনি রোগ এবং কিছু হরমোনজনিত রোগে ভোগেন তাদের উচ্চ রক্তচাপ হতে পারে। সাধারণত গর্ভবতী মহিলা গর্ভের পাঁচ মাস পর থেকে উচ্চ রক্তচাপে ভুগে থাকেন।

যেভাবে বুঝবেন আপনি উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেনঃ
আমাদের স্বাভাবিক রক্তচাপ ১২০/৮০ মিলিমিটার। আর ১২০/৮০ থেকে ১৩৯/৮৯ মিলিমিটার পর্যন্ত রক্তচাপ বেড়ে গেলে তখন আমরা একে উচ্চ রক্তচাপের পূর্বাভাস হিসেবে ধরে নিতে পারি। এই রক্তচাপে সাধারণত প্রেসার কমানোর ওষুধ দেয়া হয় না, তবে বেশ কিছু নিয়ম মেনে চলতে হয়। যেমন-কাঁচা বা ভাজা লবণ না খাওয়া, লবণযুক্ত খাবার যেমন- চানাচুর, লবণযুক্ত বিস্কুট, পনির, বোরহানি, লবণযুক্ত শুঁটকি খেতে নিষেধ করা করা হয়। তবে যখন রক্তচাপ ১৪০/৯০ মিলিমিটার হয়ে যায় তখন একে উচ্চ রক্ত চাপের প্রথম স্টেজ বলা হয়ে থাকে। এসময় চিকিৎসকরা প্রেসারের কিছু ওষুধ দিয়ে থাকেন। আর যদি রক্তচাপ ১৬০/১০০ মিলিমিটার হয়ে যায় তাহলে একে উচ্চরক্ত চাপের দ্বিতীয় স্টেজ বলা হয়ে থাকে। তখন চিকিৎসকরা ওষুধের ডোজ কমানো বা বাড়ানোর মাধ্যমে একে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসার চেষ্টা করে থাকেন।

উপসর্গ এবং ক্ষতিকর দিকঃ
উচ্চ রক্তচাপ হলে সাধারণত মাথার পেছন দিকে এবং ঘাড়ে অনেক ব্যথা হয়ে থাকে। সকালের দিকে এবং হাঁটাচলার সময় ব্যথার তীব্রতা বাড়ে। আবার কেউ কেউ মাথা অনেক গরম অনুভব করেন। এছাড়াও স্মরণশক্তি কমে যাওয়া, কাজকর্মে মনোনিবেশ করতে না পারা, মাথা ঘোরা, ঘুমের ব্যাঘাত, বুক ধড়ফড় করা, বুকে চাপ অনুভব, চোখে ঝাপসা দেখা ইত্যাদি উপসর্গ গুলো উচ্চ রক্তচাপের ক্ষেত্রে  দেখা দিতে পারে। আর উচ্চ রক্তচাপের ফলে আমাদের শরীরের অনেক ক্ষতি হয়ে থাকে। যদি উচ্চ রক্তচাপ সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করা না হয়ে তাহলে বেশ কিছু জটিলতা দেখা যায়। যেমন- হৃদরোগ বা হৃৎপিণ্ড বড় হয়ে যাওয়া, হার্টফেইলিউর অর্থাৎ হার্ট দুর্বল হয়ে যায়। এছাড়াও মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণজনিত জটিলতা, পক্ষাঘাতগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। একই সাথে এর ফলে কিডনি রোগ জটিলতা, স্নায়ুদুর্বলতা ও চোখ অন্ধ হয়ে যেতে পারে।

উচ্চ রক্তচাপ হলে যা করবেনঃ
সারা বিশ্বে প্রাপ্তবয়স্ক প্রতি তিনজনের মধ্যে একজন ব্যক্তি উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন এবং প্রতি দুইজনের একজন উচ্চ রক্তচাপের রোগী তাদের রোগ সম্পর্কে জানেন না। আমাদের দেশে প্রায় ১ থেকে ১.৫ কোটি লোক উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন। আর সবচেয়ে আশ্চর্যের ব্যাপার হলো তাদের মধ্যে শতকরা ৭০ ভাগ রোগী জানে না যে তাদের উচ্চ রক্তচাপ আছে। যেহেতু এটি একটি নীরব ঘাতক, তাই উচ্চ রক্তচাপ হলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শে নিয়মিত ওষুধ খেতে হবে। এক বা দুই সপ্তাহ পর পর রক্তচাপ মাপতে হবে। যদি উচ্চ রক্তচাপ একদম স্বাভাবিক হয়ে যায় তারপরেও চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ বন্ধ করা যাবে না। নিজের ইচ্ছামতো কখনোই ওষুধ বদল করা যাবে না। অনিয়মিত ও অপর্যাপ্ত ওষুধ সেবনে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়। উচ্চ রক্তচাপ প্রতিরোধে প্রতিদিন আঁধা ঘন্টা হাটতে হবে। এছাড়াও অতিরিক্ত ওজন একদম নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। একই সাথে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখা, লবণযুক্ত ও তৈলাক্ত খাবার এড়িয়ে চলা, পর্যাপ্ত পরিমাণ শাকসবজি, ফলমূল, আঁশযুক্ত খাবার, রসুন, মাছ খাওয়া, দুশ্চিন্তা মুক্ত জীবন যাপন করা এবং ধূমপান থেকে বিরত থাকতে হবে এবং নিয়মিত ব্যায়াম করতে হবে। এতেই আমাদের উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে আসবে।

উপরে